৩ মাস ধরে জ্বলেছিল এই পৃথিবী সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯তলা গ্রন্থাগার!

প্রায় ৭০০ বছর ধরে বিশ্বকে শিক্ষার আলো দেখিয়ে গেছে যে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে কিন্তু ১২শ শতাব্দীতে জ্বালিয়ে দেওয়া হল। মনে করা হয় সেই আগুনে তিন মাস ধরে জ্বলেছিল। আগুণ আর ধোয়ায় আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে গেছিল এতদিনের সংরক্ষণের জ্ঞানের ভাণ্ডার। 

ভারতবর্ষ। শিক্ষা থেকে সংস্কৃতি সর্বত্রই অগাধ বিস্তার। আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর আগে গুপ্ত সম্রাটগণ এবং কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধনের পৃষ্ঠপোষকতায় বিকাশ ঘটেছিল বিশ্বের সব থেকে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি নালন্দার। নালন্দা নামটি এসেছে তিনটি শব্দ থেকে।  ন + আলম + দা। যার মানে করলে দাড়ায় অবিরত দান”। 

গল্প নয়, সত্যি! লটারির টাকায় তৈরি হয়েছিল আজকের কলকাতা

এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল জ্ঞানের ভাণ্ডার। শুধুমাত্র ধর্মীয়গ্রন্থই নয় এখানে পড়ানো হত সাহিত্য, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শনশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, চিত্রকলার মত বিষয়। এই প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে পড়ানোর জন্য বানান হয়েছিল একটি গ্রন্থাগার যা অবস্থিত ছিল তিনটি বহুতলবিশিষ্ট ভবন নিয়ে। ভবনগুলির নাম ছিল ‘রত্নসাগর’ (‘রত্নের মহাসাগর’), ‘রত্নোদধি’ (‘রত্নের সমুদ্র’) ও ‘রত্নরঞ্জক’ (‘রত্নখচিত’)। রত্নোদধি ছিল নয়টি তলবিশিষ্ট ভবন। এখানেই পবিত্রতম ধর্মগ্রন্থ প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র ও গুহ্যসমাজ রক্ষিত ছিল। এখানে ১লাখ ২ লাখ নয় অনুমান করা হয় ৯০লাখ বই আর পাণ্ডুলিপি ছিল এই গ্রন্থাগারে। ঐতিহাসিক নিহাররঞ্জন রায় তাঁর বিখ্যাত “বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব)” গ্রন্থে লিখেছেন, “নালন্দার মহাবিহারের সঙ্গে ষষ্ঠ-সপ্তম শতকীয় বাংলার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষাদীক্ষার ঘনিষ্ঠ যোগাযাগ ছিল এবং বাংলার শিক্ষার্থী, আচার্য, রাজবংশ নালন্দা-মহাবিহারের সংবর্ধনের যে প্রয়াশ করিয়াছেন তাহা তুচ্ছ করিবার মতো নয়।" 



প্রায় ৭০০ বছর ধরে বিশ্বকে শিক্ষার আলো দেখিয়ে গেছে নালন্দা।এর মধ্যে বহুবার আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু ১২শ শতাব্দীতে বখতিয়ার খলজি নালন্দাকে জ্বালিয়ে দেয়। মনে করা হয় সেই আগুনে নালন্দার গ্রন্থাগার তিন মাস ধরে জ্বলেছিল। আগুণ আর ধোয়ায় আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে গেছিল এতদিনের সংরক্ষণের জ্ঞানের ভাণ্ডার। 


খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা নালন্দা একটি মহাবিহার অর্থাৎ বিশাল বৌদ্ধমঠের অংশ ছিল।যার ধ্বংসাবশেষ আজও ৫৭ একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিছু তথ্য অনুযায়ি, নালন্দা মহাবিহার তৈরি হয় এক বিশাল আম বাগানের মধ্যে।প্রায় ৫০০জন  ব্যবসায়ী ওই জায়গা গৌতম বুদ্ধকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, নালন্দা তৈরি হয় খ্রিস্টীয় ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীতে গুপ্ত সম্রাটগণ এবং পরবর্তীকালে কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধনের পৃষ্ঠপোষকতায়।


বিভিন্ন সময়ে এখানে অনেকেই শিক্ষকতা করেছেন। যেমন নাগার্জুন, বুদ্ধপালিতা, শান্তিরক্ষিত, আর্যদেব নানান জ্ঞানী ব্যাক্তিরা । নালন্দায় শিক্ষাত্রী কারা ছিল জানেন? ধর্মপাল, অতীশ দীপঙ্কর, হিউয়েন সাং- এর মতও বহু বিশিষ্ট ব্যাক্তিগন। 



নালন্দায় আটটি পৃথক চত্বর ও দশটি মন্দির ছিল। সেই সঙ্গে ছিল অনেকগুলি ধ্যানকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষ। নালন্দা ছিল একটি আবাসিক মহাবিহার। এখানে ছাত্রদের বহুশয্যাবিশিষ্ট বাসকক্ষও ছিল। খ্যাতির মধ্যগগনে থাকাকালীন নালন্দা মহাবিহারে ১০,০০০ ছাত্র ও ২,০০০ শিক্ষক ছিলেন। চীনা তীর্থযাত্রীদের মতে অবশ্য নালন্দার ছাত্রসংখ্যা ছিল ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ জনের মধ্যবর্তী।কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য ও তুরস্ক থেকে ছাত্র ও পণ্ডিতেরা এখানে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করতে আসতেন।



হিউয়েন সাং-এর বিবরণীতে ৭ম শতাব্দীর নালন্দা মহাবিহারের একটি বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, কীভাবে সুশৃঙ্খল সারিবদ্ধ স্তম্ভ, সভাগৃহ, হার্মিক ও মন্দিরগুলিকে “আকাশে কুয়াশার উপর উড্ডয়নশীল” মনে হত, যাতে নিজেদের কক্ষ থেকে ভিক্ষুরা “বায়ু ও মেঘের জন্মদৃশ্যের সাক্ষী থাকতে পারতেন। মঠগুলির চারিপাশে একটি নীল হ্রদ প্রবাহিত থাকত। সেই হ্রদে ভেসে থাকত পূর্ণ-প্রস্ফুটিত নীল পদ্ম; সুন্দর সুন্দর লাল কনক ফুল এখানে ওখানে দুলত, আর আম্রকুঞ্জের বাইরে অধিবাসীরা তাঁদের গভীর ও নিরাপদ আশ্রয় লাভ করতেন।"

নালন্দা সময়ের বিপর্যয় সহ্য করতে পারেনি। সেজন্য ডক্টর আবদুল কালামের পরামর্শে ২০১৪ সালে নালন্দা আবার জন্ম নেয় আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপে। নালন্দার মত বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করে প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষ গোটা বিশ্বকে শিক্ষা প্রদান করে চলেছে। আশা রাখি আগামী দিনেও ভারতবর্ষ শিক্ষার আলোকে এই ভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাবে।




তথ্য সূত্র : বাঙ্গালীর ইতিহাস - নীহাররঞ্জন রায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, উইকিপিডিয়া

Comments

Popular posts from this blog

গল্প নয়, সত্যি! লটারির টাকায় তৈরি হয়েছিল আজকের কলকাতা

জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার ১৭২ বছর

নবাব সিরাজউদ্দৌলা কেন হত্যা করেছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের সবচেয়ে সুন্দরী মহিলাকে?